মতিঝিলনিউজ ধর্ম ও জীবন ডেস্ক : মানব ইতিহাসে এমন কিছু চরিত্র আছে, যাদের কাহিনি শুধু অতীতের গল্প নয়, বরং চিরন্তন পথনির্দেশ। তেমনি এক অনন্য ব্যক্তিত্ব হলেন জুলকারনাইন, যার ঘটনা আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনের সুরা কাহাফ-এ (আয়াত ৮৩–৯৮) বর্ণনা করেছেন। একবার মানুষ মহানবী (সা.)-এর কাছে জানতে চাইল জুলকারনাইন কে? কি তার পরিচয়? তখন আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তারা তোমার কাছে জুলকারনাইন সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে। বলো, আমি তোমাদের কাছে তার কিছু কাহিনি বর্ণনা করব।
’ (সুরা : কাহাফ, আয়াত : ৮৩)। তার ঘটনার সূচনাই বুঝিয়ে দেয়, এটি শুধু একটি ঐতিহাসিক বিবরণ নয়, বরং শিক্ষণীয় এক আলোকবর্তিকা।
আল্লাহ তাআলা জুলকারনাইনকে পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন এবং তাকে দিয়েছিলেন ক্ষমতা, জ্ঞান ও নানা উপায়-উপকরণ। আল্লাহ বলেন, ‘আমি তাকে পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত করেছিলাম এবং তাকে সব বিষয়ে উপায়-উপকরণ দিয়েছিলাম।
’ (সুরা : কাহাফ, আয়াত : ৮৪)। কিন্তু এই ক্ষমতা তাকে অহংকারী করেনি, বরং তিনি হয়ে উঠেছিলেন ন্যায়বিচার ও আল্লাহভীতির এক উজ্জ্বল প্রতীক। তার জীবন ছিল এক ধারাবাহিক সফর—যেখানে প্রতিটি যাত্রাই মানুষের জন্য নতুন শিক্ষা নিয়ে আসে।
তিনি প্রথমে পশ্চিমের দিকে যাত্রা করেন এবং এমন এক স্থানে পৌঁছান, যেখানে সূর্যাস্ত যেন কাদাময় পানিতে ডুবে যাচ্ছে।
আল্লাহ বলেন, ‘অবশেষে তিনি সূর্যাস্তের স্থানে পৌঁছলেন…।’(সুরা : কাহাফ, আয়াত : ৮৬)। সেখানে তিনি এক জাতির মুখোমুখি হন। আল্লাহ তাকে স্বাধীনতা দেন—তিনি চাইলে তাদের শাস্তি দিতে পারেন কিংবা দয়া করতে পারেন। তখন জুলকারনাইন তার ন্যায়পরায়ণতার পরিচয় দিয়ে বলেন, কোরআনের ভাষায়, ‘যে জুলুম করবে, তাকে শাস্তি দেব, এরপর সে তার প্রতিপালকের কাছে ফিরে যাবে এবং তিনি তাকে কঠিন শাস্তি দেবেন।
আর যে ঈমান আনবে ও সৎকর্ম করবে, তার জন্য থাকবে উত্তম প্রতিদান।’ (সুরা : কাহাফ, আয়াত : ৮৭-৮৮)।
এরপর তিনি পূর্বদিকে যাত্রা করেন। সেখানে তিনি এমন এক জাতির সন্ধান পান, যাদের জীবন ছিল অত্যন্ত সরল প্রকৃতির। আল্লাহ বলেন, ‘তিনি এমন এক জাতির কাছে পৌঁছলেন, যাদের জন্য সূর্যের বিপরীতে কোনো আড়াল ছিল না।’ (সুরা : কাহাফ, আয়াত : ৯০)। তিনি তাদের জীবনযাত্রা উপলব্ধি করেন, তাদের বাস্তবতা বোঝেন এবং সেই অনুযায়ী আচরণ করেন। এখানেই বোঝা যায়, একজন সত্যিকারের নেতা কখনো এক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে সবকিছু বিচার করেন না; বরং মানুষের অবস্থান ও প্রেক্ষাপট অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেন। তার তৃতীয় সফর ছিল সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি দুই পাহাড়ের মধ্যবর্তী এক অঞ্চলে পৌঁছান, যেখানে এক দুর্বল জাতি বসবাস করত। তারা তার কাছে আর্তনাদ করে জানায়, ‘ইয়াজুজ ও মাজুজ পৃথিবীতে ভয়াবহ অশান্তি সৃষ্টি করছে।’ (সুরা : কাহাফ, আয়াত : ৯৪)।
তারা জুলকারনাইনকে প্রস্তাব দেয় যে, তিনি যেন তাদের জন্য একটি প্রাচীর নির্মাণ করেন, বিনিময়ে তারা তাকে পারিশ্রমিক দেবে। কিন্তু জুলকারনাইন এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বলেন, ‘আমার প্রতিপালক আমাকে যা দিয়েছেন, সেটাই যথেষ্ট।’ (সুরা : কাহাফ, আয়াত : ৯৫)। তার এই উত্তরে স্পষ্ট হয়—তিনি ক্ষমতা বা সম্পদের জন্য কাজ করতেন না, বরং মানুষের কল্যাণই ছিল তার একমাত্র উদ্দেশ্য।
এরপর তিনি এক অসাধারণ প্রকৌশল দক্ষতার মাধ্যমে লোহা ও গলিত তামা ব্যবহার করে একটি শক্তিশালী প্রাচীর নির্মাণ করেন, যা ইয়াজুজ ও মাজুজের ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড থেকে সেই জাতিকে রক্ষা করে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তারা তা অতিক্রম করতে পারল না, ভেদ করতেও পারল না।’ (সুরা : কাহাফ, আয়াত : ৯৭)। এত বড় একটি কাজ সম্পন্ন করার পরও তিনি নিজের কৃতিত্ব দাবি করেননি; বরং বিনয়ের সাথে বলেন, ‘এটি আমার প্রতিপালকের অনুগ্রহ।’ (সুরা : কাহাফ, আয়াত : ৯৮) সাফল্যের শীর্ষে থেকেও তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ বিনয়ী এবং আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ এক বান্দা।
জুলকারনাইনের কাহিনি আমাদের শেখায় যে, প্রকৃত শক্তি শুধু ক্ষমতায় নয়, বরং সেই ক্ষমতার সঠিক ব্যবহারে। আজকের পৃথিবীতে, যেখানে অনেক সময় ক্ষমতা অন্যায়ের হাতিয়ার হয়ে ওঠে, সেখানে জুলকারনাইনের জীবন আমাদের সামনে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন—কিভাবে একজন নেতা হতে পারে ন্যায়বান, দয়ালু এবং নিঃস্বার্থ। অতএব, আমরা যদি আমাদের নিজ নিজ অবস্থান থেকে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করি, মানুষের পাশে দাঁড়াই এবং আমাদের সাফল্যকে আল্লাহর দান হিসেবে স্বীকার করি, তবে আমরাও হবো এই মহান কাহিনির অংশীদার।
মতিঝিলনিউজ/এআর