মতিঝিলনিউজ প্রতিবেদক : দক্ষিণ চট্টগ্রামের প্রায় সাত লাখ মানুষের চিকিৎসাসেবার প্রধান ভরসাস্থল পটিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ১০১ শয্যায় উন্নীত করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের আলোকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম শুরু করেছে।
দীর্ঘদিন ধরে শয্যা সংকট, চিকিৎসক স্বল্পতা ও রোগীর অতিরিক্ত চাপের মধ্যে পরিচালিত হওয়া হাসপাতালটির সক্ষমতা বাড়ানোর এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন স্থানীয় জনসাধারণ, জনপ্রতিনিধি ও স্বাস্থ্যসেবা সংশ্লিষ্টরা।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রশাসন শাখা থেকে বুধবার (৩ জুন) জারি করা এক পত্রে জানানো হয়, সরকারের নির্দেশনায় দেশের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোকে পর্যায়ক্রমে ১০১ শয্যায় উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে গণপূর্ত অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত একটি পরিদর্শন দল হাসপাতাল পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, জনবল ও সম্প্রসারণ পরিকল্পনা যাচাই করবে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. জালাল উদ্দিন মোহাম্মদ রুমী স্বাক্ষরিত ওই পত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রয়োজনীয় তথ্য ও সহযোগিতা প্রদানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
পটিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ আবু তৈয়ব বলেন, ‘পটিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রতিদিন বহির্বিভাগে গড়ে ৮০০ থেকে ১ হাজার রোগী চিকিৎসাসেবা নিতে আসেন। বর্তমানে ৫০ শয্যার হাসপাতাল হলেও অনেক সময় ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি রোগী ভর্তি রাখতে হয়। হাসপাতালটি ১০১ শয্যায় উন্নীত হলে রোগীদের ভোগান্তি কমবে, বিশেষায়িত সেবার সুযোগ বাড়বে এবং চিকিৎসা ব্যবস্থার সামগ্রিক মান উন্নত হবে।’
তিনি আরো বলেন, হাসপাতালটিতে দক্ষিণ চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলা থেকে রোগীরা চিকিৎসা নিতে আসেন। ফলে জনসংখ্যার তুলনায় বর্তমান অবকাঠামো যথেষ্ট নয়।
পটিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ১৯৪৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হাসপাতালটি দীর্ঘ সময় ২০ শয্যার স্বাস্থ্যকেন্দ্র হিসেবে পরিচালিত হয়। পরে ১৯৯৪ সালে বিএনপি সরকারের আমলে এটি ৩১ শয্যায় উন্নীত করা হয়। ২০০৬ সালে চারদলীয় জোট সরকারের সময়ে হাসপাতালটি ৫০ শয্যায় উন্নীত হয়। প্রায় দুই দশক পর আবারও হাসপাতালটির শয্যা বৃদ্ধি ও আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
চট্টগ্রাম-১২ (পটিয়া) আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ এনামুল হক এনাম জাতীয় সংসদে পটিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ২০০ শয্যায় উন্নীত করার দাবি তুলে ধরেন। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘পটিয়া দক্ষিণ চট্টগ্রামের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও জনবহুল উপজেলা। এখানে শুধু পটিয়ার মানুষ নয়, পার্শ্ববর্তী উপজেলা থেকেও বিপুলসংখ্যক রোগী চিকিৎসাসেবা নিতে আসেন। বর্তমান বাস্তবতায় ৫০ শয্যার হাসপাতাল দিয়ে স্বাস্থ্যসেবার চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয়। সরকার ১০১ শয্যায় উন্নীত করার যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা অত্যন্ত ইতিবাচক। তবে ভবিষ্যতে এটিকে ২০০ শয্যার পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল হিসেবে গড়ে তোলার জন্য আমি সংসদে এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে জোরালো দাবি অব্যাহত রাখব।’
স্থানীয় ব্যবসায়ী নজরুল ইসলাম বলেন, ‘রোগীর চাপ এত বেশি যে অনেক সময় বেড না পেয়ে মেঝেতে চিকিৎসা নিতে হয়। হাসপাতাল সম্প্রসারণ হলে সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবে।’
পটিয়া পৌরসভার বাসিন্দা রেহানা আকতার বলেন, ‘প্রসব ও শিশু চিকিৎসার জন্য প্রায়ই রোগীদের চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠাতে হয়। শয্যা ও চিকিৎসা সুবিধা বাড়লে এসব সেবা স্থানীয়ভাবেই পাওয়া যাবে।’
বর্তমানে পটিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বহির্বিভাগ, জরুরি বিভাগ, মাতৃসদন, অপারেশন থিয়েটারসহ বিভিন্ন সেবা চালু থাকলেও রোগীর তুলনায় শয্যা, চিকিৎসক ও আধুনিক যন্ত্রপাতির ঘাটতির অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে ঈদ, দুর্ঘটনা কিংবা মৌসুমি রোগের সময়ে হাসপাতালটিতে রোগীর চাপ কয়েকগুণ বেড়ে যায়।
স্বাস্থ্যখাত সংশ্লিষ্টদের মতে, ১০১ শয্যায় উন্নীতকরণের মাধ্যমে হাসপাতালটিতে নতুন ভবন নির্মাণ, চিকিৎসক ও নার্স নিয়োগ, আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম সংযোজন এবং বিশেষায়িত সেবা চালুর সুযোগ সৃষ্টি হবে। এতে দক্ষিণ চট্টগ্রামের লাখো মানুষের স্বাস্থ্যসেবা আরও সহজলভ্য ও মানসম্মত হবে।
পটিয়াবাসীর প্রত্যাশা, দীর্ঘদিনের দাবি অনুযায়ী অবকাঠামোগত উন্নয়ন দ্রুত বাস্তবায়িত হলে পটিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ভবিষ্যতে দক্ষিণ চট্টগ্রামের অন্যতম আধুনিক উপজেলা হাসপাতাল হিসেবে গড়ে উঠবে।
মতিঝিলনিউজ/এআর