মতিঝিলনিউজ ধর্ম ও জীবন ডেস্ক : কোরআনুল কারিমকে যিনি পূর্ণ আন্তরিকতার সঙ্গে পাঠ করবেন এবং এই মহাগ্রন্থ থেকে নিজের জীবনে সত্য আলো গ্রহণ করতে চান, তার জন্য প্রথম শর্ত হচ্ছে—এ গ্রন্থের বড়ত্ব ও মর্যাদা দিয়ে তার অন্তর পরিপূর্ণ থাকতে হবে; দেহের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বিশ্বাসের এই আলো প্রবাহিত হতে হবে। আল্লাহ তাআলার অনাদি গুণগুলো থেকে বিশেষ একটি গুণ হলো এই কালাম। সৃষ্টিজগতের সঙ্গে এই গুণের কোনো তুলনা ও সাদৃশ্য হয় না, সম্পর্কও হয় না; তবু তিনি আপন অনুগ্রহে অনাদি এই গুণটিকে আরবি ভাষার পোশাক পরিয়ে পৃথিবীতে অবতীর্ণ করেছেন। একে প্রতিষ্ঠিত করেছেন তাঁর ও তাঁর বান্দাদের মধ্যে সম্পর্কের সেতুবন্ধরূপে।
[সিরাতে মুস্তাকিম, ইসমাইল শহিদ (রহ.)]
বিশ্বাসের জায়গা থেকে স্বাভাবিকভাবে সব মুসলমানই মান্য করেন যে কোরআন আল্লাহ তাআলার পবিত্র কালাম বা কথামালা; তবে এই পবিত্র কথামালা থেকে উপকৃত হওয়ার জন্য অসচেতন ও অমনোযোগী বিশ্বাস যথেষ্ট নয়, বরং সে বিশ্বাসটিকে সব সময় হৃদয় ও মস্তিষ্কে জাগিয়ে রাখা একান্ত দরকার।
কোরআনে কারিমে বারবার বলা হয়েছে, ‘মহাগ্রন্থ এই কোরআন আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে অবতীর্ণ করা হয়েছে, এটা তাঁরই বাণী।’
এই যে কোরআনের সঙ্গে আল্লাহ তাআলা নিজের সম্পর্ক ও সম্বন্ধটির কথা পুনরাবৃত্তি করছেন। এটা শুধু এ গ্রন্থের সনদ বা সূত্র বর্ণনার জন্য নয়, বরং সূত্র বর্ণনার পাশাপাশি এ কথা বোঝানোও উদ্দেশ্য—এটি সাধারণ কোনো গ্রন্থ নয়, গুরুত্ব ও মর্যাদায়, পবিত্রতা ও সৌন্দর্যে অনন্য ও অসাধারণ।
পৃথিবীর কোনো গ্রন্থের সঙ্গে এর তুলনা হতে পারে না। একে পাঠ ও গ্রহণ করতে হবে বোধ ও উপলব্ধির সুউচ্চ জায়গা থেকে। এ কথা আমরা কেন বলছি? কারণ, এটা স্বীকৃত বিষয় যে কথকের মর্যাদা ও মহত্ত্বের কারণে কথাগুলো সুমহান এবং মর্যাদাপূর্ণ হয়ে ওঠে। আল্লাহ তাআলার সঙ্গে কোরআনুল কারিমের এই সম্বন্ধের কথা মাথায় নিয়ে এই গ্রন্থ এবং এতে বর্ণিত সব বিষয়ের প্রতি হৃদয়ে পূর্ণ ভক্তি, বিশ্বাস ও আস্থা লালন করলেই শুধু প্রকৃত অর্থে এ থেকে ঈমানি নুর লাভ করা যাবে।
সীমা লঙ্ঘন ও অজ্ঞতায় নিমজ্জিত কোনো মানুষ যদি কোরআনের সঙ্গে আল্লাহ তাআলার এই সম্পর্ক ও সম্বন্ধের মর্যাদা অনুভব না করে, এটা তার নিঃস্বতা ও সংকীর্ণ দৃষ্টির ফল; অন্যথায় বাস্তবতা হলো এই, আল্লাহ তাআলা বলেন,
‘আমি যদি পর্বতের ওপর এই কোরআনকে অবতীর্ণ করতাম, তা হলে তুমি দেখতে আল্লাহর ভয়ে সেই পর্বত নত ও বিদীর্ণ হয়ে গেছে।’ (সুরা : হাশর, আয়াত : ২১)
অর্থাৎ কোরআনুল কারিম যার গুণ, সেই আল্লাহ তাআলার বড়ত্ব ও মর্যাদা এত বিপুল যে কোনো পাহাড়ের ওপর একে অবতীর্ণ করলে, সেই কথকের শক্তি ও মর্যাদার প্রভাবে পাহাড়টি নত হয়ে দেবে যেত এবং ভয়ে হয়ে যেত চূর্ণবিচূর্ণ। কোরআনুল কারিমের সঙ্গে আল্লাহ তাআলার এই সম্বন্ধের বিশ্বাস ও অকুণ্ঠ স্বীকৃতিতে যার হৃদয় পূর্ণ, তার অবস্থা কেমন হয়, সে বিবরণও তিনি দিয়েছেন—
‘রাসুলের কাছে যা অবতীর্ণ করা হয়েছে, তারা যখন তা শ্রবণ করে, তুমি দেখবে, সত্য চেনার কারণে তাদের চক্ষু অশ্রুসজল।’ (সুরা : মায়িদা, আয়াত : ৮৩)
এই সৌভাগ্যবান মানুষজন যখন আল্লাহ তাআলার কালাম শ্রবণ করে, তখন তাদের হৃদয় কেঁপে ওঠে, দেহের পশম দাঁড়িয়ে যায় এবং শঙ্কা ও ভীতির কারণে তাদের মধ্যে এক আজব অবস্থা তৈরি হয়। তাদের তনুমন, ভেতর-বাইরে সব অস্তিত্ব আকুল হয়ে ওঠে, ভয়ে, ভালোবাসায়, শ্রদ্ধায় বিনম্র ও বিনত হয়ে আসে—
‘আল্লাহ উত্তম বাণী তথা কিতাব নাজিল করেছেন, যা সামঞ্জস্যপূর্ণ, পুনঃ পুনঃ পঠিত।
এতে তাদের চামড়ার ওপর লোম কাঁটা দিয়ে ওঠে, যারা তাদের পালনকর্তাকে ভয় করে; এরপর তাদের চামড়া ও অন্তর আল্লাহর স্মরণে বিনম্র হয়। এটাই আল্লাহর পথনির্দেশ, এর মাধ্যমে আল্লাহ যাকে ইচ্ছা পথ প্রদর্শন করেন। আর আল্লাহ যাকে গোমরাহ করেন, তার কোনো পথপ্রদর্শক নেই।’
(সুরা : জুমার, আয়াত : ২৩)
আল্লাহর বাণী শুনতে পেলে তাদের হৃদয় প্রকম্পিত হয় এবং যতই শোনে, তাদের ঈমান ততই বাড়তে থাকে।
পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে—‘যারা ঈমানদার, তারা এমন—যখন আল্লাহর নাম নেওয়া হয়, তখন ভীত হয়ে পড়ে তাদের অন্তর। আর যখন তাদের সামনে পাঠ করা হয় কালাম, তখন তাদের ঈমান বেড়ে যায় এবং তারা স্বীয় পরোয়ারদিগারের প্রতি ভরসা পোষণ করে।’ (সুরা : আনফাল, আয়াত : ২)
এমনিভাবে এখানে তারা নিজেদের আত্মার ব্যাধি থেকে মুক্তি লাভের উপকরণ খুঁজে পায়—‘আমি কোরআনে এমন বিষয় নাজিল করি, যা রোগের সুচিকিৎসা এবং মুমিনের জন্য রহমত। গুনাহগারদের তো এতে শুধু ক্ষতিই বৃদ্ধি পায়।’ (সুরা : ইসরা/বনি ইসরাঈল, আয়াত : ৮২)
এখানে মূল যে বিষয়টি বলা হয়েছিল অর্থাৎ কোরআনুল কারিম থেকে উপকার লাভ করার জন্য জরুরি হলো এই গ্রন্থের বড়ত্ব ও মহত্ত্ব এবং সত্যতার বিশ্বাস রক্তের মতো দেহের শিরা-উপশিরায় প্রবাহিত হতে হবে; পাশাপাশি একে এতটা যত্নের সঙ্গে তিলাওয়াত ও অধ্যয়ন করতে হবে, যেন এটি তার একান্ত হৃদয়ের বন্ধু, আমরণ সঙ্গী। ইমাম শাতিবি (মৃত্যু : ৭৯০ হি.) যথার্থই বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি দ্বিনকে জানতে চায়, তার জন্য জরুরি হলো, কোরআনুল কারিমকে নিজের একান্ত সঙ্গী হিসেবে গ্রহণ করা; দিনরাত এর সঙ্গে লেগে থাকা। কোরআনের সঙ্গে এ সম্পর্কটি হতে হবে দুই দিক থেকে ইলমি ও আমলি। অর্থাৎ জ্ঞানগতভাবে এবং বাস্তব জীবনযাপনে। কোনো একটিকে গ্রহণ করা যথেষ্ট নয়। দুটিকেই একসঙ্গে গ্রহণ করতে হবে। কেউ যদি এভাবে সম্পর্ক রাখতে পারে, আশা করা যায়, সে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছতে সক্ষম হবে।’ (আল-মুওয়াফাকাত : ৩/৩৪৬)
ভাষান্তর : মাওলানা সাখাওয়াত উল্লাহ
মতিঝিলনিউজ/এআর