মতিঝিলনিউজ ক্রীড়া ডেস্ক : যুবশক্তি হচ্ছে আমাদের দেশের অন্যতম প্রধান সম্পদ। দেশের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ এদের ওপর নির্ভর করছে। তবে আমাদের এই যুবশক্তি মূল্যবোধের অবক্ষয়ের মধ্য দিয়েও যাচ্ছে। দেশ ও পারিপার্শ্বিকতা বুঝে ওঠার যে ব্যাপার এবং যুবশক্তির যে সামাজিক দায়দায়িত্ব, সামাজিক বন্ধন—এগুলোর মধ্যে কেমন জানি ঘাটতি দেখতে পাচ্ছি।
এই অবক্ষয় রোধ করতে হলে একদিকে যেমন বুদ্ধিভিত্তিক চর্চা প্রয়োজন, তাদের নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত করা প্রয়োজন; তেমনি তাদের পড়াশোনার পাশাপাশি যে কাজের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি যোগাযোগ করিয়ে দেওয়া দরকার, সব খেলা যেন মাঠে থাকেসেটি হচ্ছে খেলাধুলা। তাই খেলাধুলা শুধু বিনোদনের বিষয় নয়। আজ আমাদের দেশের যে অন্যতম প্রধান উপাদান যুবশক্তি, সেটির উন্নয়নের জন্যও সব ধরনের খেলাধুলা অপরিহার্য। তো এদিকে সরকারকে প্রাধান্য দিয়ে কর্মসূচি নিতে হবে।
এবং প্রাধান্য দেওয়ার অর্থ হলো, এখানে যা কিছু প্রয়োজন সেসব করা; এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, ক্রীড়ার জন্য যথাসম্ভব বাজেট বাড়িয়ে দেওয়া। সার্বিকভাবে আমি বলতে পারি যে নীতিগতভাবে আগামীতে যে সরকারই আসুক, এই যুবশক্তির উন্নয়নের সঙ্গে খেলাধুলাকে সম্পৃক্ত করে তারা এই ধরনের উন্নয়নমূলক ব্যাপক কার্যক্রম গ্রহণ করবে।
সেই সঙ্গে আমি চাইব, মাঠের সংখ্যা বাড়ানো হোক। আমাদের দেশে ক্রীড়াঙ্গন স্থবির হয়ে যাবে, যদি মাঠের দিকে নজর না দেওয়া হয়।
অতীতে মাঠের সংকট ছিল না, দেশে প্রচুর জায়গা ছিল। সরকারের খাসজমি ছিল। তখন কোথাও একটি হাই স্কুল তৈরি করা হলে সেখানে অন্তত একটি মাঠ থাকত। না হলে কোনো হাই স্কুলই হতো না। গার্লস স্কুল হতো ঘেরা দেয়ালের ভেতরে, তার মধ্যেও মেয়েদের খেলাধুলা করার জায়গা থাকত।
আজকাল আমরা কোথাও ফাঁকা জায়গা রাখছি না। এমনকি সরকারি যে খাসজমিগুলো, সেখানেও নানা রকম অট্টালিকা তৈরি হচ্ছে। শুধু ফুটবল নয়, প্রতিটি খেলার জন্য মাঠ দরকার; এবং আমি মনে করি, উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত সরকারের খাসজমি হোক অথবা কেনা জমিতে হোক, পর্যাপ্ত পরিমাণে খেলার জন্য প্রচুর মাঠ দরকার। ক্রিকেটের জন্য দরকার, ফুটবলের জন্য দরকার, অন্যান্য খেলার জন্যও দরকার। তবে এই দুটি খেলার জন্য বড় মাঠ লাগে। আমাদের অন্যান্য যে খেলাধুলা, যেমন—ভলিবল, হাডুডু, কাবাডি, কিংবা অন্যান্য খেলার জন্য হয়তো অত বড় মাঠ লাগে না। হকির জন্য লাগে, তো হকির প্রচলন আমাদের দেশে এখন অতটা নেই। কিন্তু ফুটবল-ক্রিকেটের জন্য উপজেলা পর্যায়ে অন্তত দুইটা বড় মাঠের ব্যবস্থা সরকারকে করতে হবে। এটির ব্যবস্থা সরকার না করলে অন্য কেউ তা পারবেও না। জেলা কিংবা উপজেলা পর্যায়ে দেখা যায় স্টেডিয়াম একটাই। কোথাও আছে, আবার কোথাও থাকলেও এর পরিচর্যা হয় না। যেখানে একটি স্টেডিয়াম আছে, সেখানে ২০ থেকে ৩০টি ফেডারেশন সারা বছর তাদের খেলা চালাতে চায়। এতে ওই মাঠে খেলোয়াড়রা খেলারই সুযোগ পায় না। তাই প্রতি জেলায় অন্তত দুটি স্টেডিয়াম তৈরি করতে হবে। এটি না হলে এই যুবশক্তিকে আমরা খেলাধুলার দিকে আনতে পারব না।
সব খেলা যেন মাঠে থাকেআমি যেহেতু ফুটবলের সঙ্গে জড়িত, একটি ব্যাপার লক্ষ করেছি, আমাদের দেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সেভাবে নেওয়া হয় না। আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর দেখলাম যে আমরা যখন কোনো আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট খেলতে যাই, তার আগে বিভিন্ন জায়গা থেকে খেলোয়াড় নিয়ে তাদের কমলাপুরে কিংবা বাফুফে ভবনের টার্ফে কিছুদিনের ক্যাম্প করা হচ্ছে। সেটিও ঠিকমতো হচ্ছে না। আবার ক্যাম্প করতে গিয়ে দেখা যাচ্ছে যে খেলোয়াড়দের থাকার জায়গা নেই। থাকার জায়গা থাকলেও সেটি মানবেতর। ভালো খাবার পাচ্ছে না। এভাবে তো একটি জাতীয় দলের পাইপলাইনের উন্নতি হতে পারে না। আমরা এটিকে এখন নির্দিষ্ট পরিকল্পনার মধ্যে আনার চেষ্টা করছি। এবং সেটি করতে গেলে একাডেমি দরকার। তাই বর্তমানে যশোরের শামসুল হুদা ফুটবল একাডেমিকে ফুটবলের জন্য দিয়ে দেওয়া হয়েছে। ওখানে ২২০ জনের থাকার জায়গা আছে। পাঁচ-ছয়টি ভিআইপি রুম আছে, যেখানে দেশি-বিদেশি কোচরা এসে থাকতে পারবে। এটিকে কেন্দ্র করে এখন আমরা চেষ্টা করছি অনূর্ধ্ব-১৯, অনূর্ধ্ব-১৭, অনূর্ধ্ব-১৫ এবং অনূর্ধ্ব-১২ বছরের চারটি গ্রুপকে ওখানে রেখে সারা বছর অনুশীলনের মধ্যে রাখতে। আশপাশের স্কুলে তাদের পড়াশোনার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। এভাবে যদি আমরা সারা বছর তাদের চর্চার ভেতরে রাখতে পারি, আমি নিশ্চিত তিন-চার বছর পর জাতীয় দলের পাশাপাশি বয়সভিত্তিক দলগুলোও আরো শক্তিশালী হবে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার নিয়ে বলতে চাই। আমাদের অন্যতম সংকট হচ্ছে, ভালো মানের কোচের সংখ্যা খুব কম। প্রধান কোচের পাশাপাশি সহকারী কোচ, ফিজিও, ট্রেনার—সবকিছু উঁচু মানের প্রয়োজন। ছেলেদের উন্নতির জন্য এখন কোচ হিসেবে গোলাম রব্বানী ছোটন আছেন। কিন্তু তাঁরও কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। আমরা ফিফা বা এএফসি থেকে যদি বয়সভিত্তিক দলের জন্য আন্তর্জাতিক মানের কয়েকজন কোচ আনতে পারি, তাহলে আমরা ফুটবলটাকে আরো সুন্দর করে এগিয়ে নিতে পারব। ফেডারেশন এ ব্যাপারে চেষ্টা করছে। আশা করছি, ভালো মানের কোচ আনতে পারব।
অনুলিখন : রানা শেখ
মতিঝিলনিউজ/এআর