মতিঝিলনিউজ ধর্ম ও জীবন ডেস্ক : ইসলাম কেবল ব্যক্তিগত ইবাদতের ধর্ম নয়; এটি হৃদয়কে হৃদয়ের সঙ্গে, মানুষকে মানুষের সঙ্গে যুক্ত করার পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। ঈমান যেমন আল্লাহর সঙ্গে বান্দার সম্পর্ক দৃঢ় করে, তেমনি মুসলিম ভ্রাতৃত্ব মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ককে দায়িত্ব ও ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ করে। এই ভ্রাতৃত্ব কোনো আবেগী স্লোগান নয়; বরং তা নির্দিষ্ট অধিকার ও কর্তব্যের মাধ্যমে বাস্তব জীবনে প্রকাশ পায়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর উম্মতকে যে সমাজ গড়ে তুলতে চেয়েছেন, তার ভিত্তি ছিল পারস্পরিক হক আদায়, সহমর্মিতা ও দায়িত্ববোধ।
সেই সমাজচিন্তারই এক সংক্ষিপ্ত কিন্তু গভীর দিকনির্দেশনা আমরা পাই নিম্নোক্ত হাদিসে—
أَنَّ أَبَا هُرَيْرَةَ قَالَ سَمِعْتُ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم يَقُولُ حَقُّ الْمُسْلِمِ عَلَى الْمُسْلِمِ خَمْسٌ رَدُّ السَّلاَمِ وَعِيَادَةُ الْمَرِيضِ وَاتِّبَاعُ الْجَنَائِزِ وَإِجَابَةُ الدَّعْوَةِ وَتَشْمِيتُ الْعَاطِسِ
আবু হুরাইরাহ্ (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে আমি বলতে শুনেছি যে, এক মুসলিমের প্রতি অপর মুসলিমের হক্ পাঁচটি: ১. সালামের জওয়াব দেয়া, ২. অসুস্থ ব্যক্তির খোঁজ-খবর নেয়া, ৩. জানাযার পশ্চাদানুসরণ করা, ৪. দা’ওয়াত কবূল করা এবং ৫. হাঁচিদাতাকে খুশী করা (আল-হামদু লিল্লাহর জবাবে ইয়ারহামুকাল্লাহ বলা)। (বুখারি, হাদিস : ১২৪০)
হাদিসের ব্যাখ্যা
এই হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) মুসলিম সমাজের ন্যূনতম সামাজিক দায়বদ্ধতার একটি রূপরেখা তুলে ধরেছেন। এগুলো নিছক শিষ্টাচার নয়; বরং ঈমানের স্বাভাবিক প্রকাশ।
সালামের জওয়াব দেওয়া মুসলিম ভ্রাতৃত্বের প্রথম সেতু।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন— “আর যখন তোমাদেরকে সালাম দেওয়া হয়, তখন তোমরা তার চেয়ে উত্তম সালাম দ্বারা বা অন্তত তারই সমতুল্য জবাব দেবে।” (সুরা নিসা : ৮৬)
ইমাম নববি (রহ.) বলেন, সালামের জবাব দেওয়া ওয়াজিব; কারণ এটি ভালোবাসা ও নিরাপত্তার ঘোষণা।
রোগীর খোঁজ নেওয়া মানবিক সহমর্মিতা ও ঈমানি দায়িত্বের অনন্য দৃষ্টান্ত। অন্য হাদিসে এসেছে, আল্লাহ কিয়ামতের দিন বলবেন— “হে আদম সন্তান! আমি অসুস্থ হয়েছিলাম, তুমি আমার সাক্ষাৎ করনি।
” (মুসলিম)। ইবনেহাজার আসকালানি (রহ.) বলেন, রোগীর খোঁজ নেওয়ার মাধ্যমে সমাজে দয়া ও আন্তরিকতা জীবিত থাকে।
জানাযার অনুসরণ মানুষকে মৃত্যুর বাস্তবতা স্মরণ করিয়ে দেয়। এটি হৃদয়কে নরম করে, দুনিয়ার মোহ কমায়। পবিত্র কোরআন স্মরণ করিয়ে দেয়— “প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে।
” (সুরা আলে ইমরান : ১৮৫)
দাওয়াত কবূল করা সামাজিক সম্পর্ক দৃঢ় করার মাধ্যম। বিশেষ করে ওয়ালিমার দাওয়াত কবূল করা সুন্নাতে মুয়াক্কাদা। এতে অহংকার ভেঙে যায় এবং পারস্পরিক সৌহার্দ্য বৃদ্ধি পায়—যা ইসলাম চায়।
হাঁচিদাতাকে ‘ইয়ারহামুকাল্লাহ’ বলা—দেখতে ছোট হলেও এটি এক গভীর দোয়া ও ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। ইমাম কুরতুবি (রহ.) বলেন, ইসলাম এমন সমাজ গড়তে চায় যেখানে ছোট ছোট আচরণেও দোয়া ও কল্যাণবোধ জড়িয়ে থাকে।
সব মিলিয়ে, এই হাদিস আমাদের শেখায়—ইসলামি সমাজ গড়ে ওঠে বড় বড় স্লোগানে নয়, বরং ছোট ছোট দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে। যদি একজন মুসলিম সচেতনভাবে এই পাঁচটি হক আদায় করে, তবে ভালোবাসা, আস্থা ও ঈমানি বন্ধনে গড়া এক সুস্থ সমাজ গড়ে উঠতে বাধ্য।
মতিঝিলনিউজ/এআর