মতিঝিলনিউজ ধর্ম ও জীবন ডেস্ক : মানব ইতিহাস শুধু ঘটনা আর তারিখের সমষ্টি নয়—এটি শিক্ষা, সতর্কতা এবং আত্ম-পর্যালোচনার এক বিশাল আয়না। কোরআনে বর্ণিত বনি ইসরায়েলের কাহিনি সেই আয়নারই একটি স্পষ্ট প্রতিফলন, যেখানে একদিকে আল্লাহর অশেষ দয়া ও অনুগ্রহ, অন্যদিকে মানুষের অবাধ্যতা ও অঙ্গীকার ভঙ্গের চিত্র ফুটে ওঠে।
সুরা বাকারার সেই আয়াতগুলো যেন আমাদের সামনে জীবন্ত করে তোলে সেই জাতির উত্থান ও পতনের ইতিহাস—একটি জাতি, যারা অসংখ্য অলৌকিক নেয়ামত পেয়েও পথভ্রষ্ট হয়েছিল। এই কাহিনি প্রতিটি যুগের মানুষের জন্য একটি জাগরণী বার্তা—আমরা কি তাদের ভুল থেকে শিক্ষা নিচ্ছি, নাকি অজান্তেই সেই একই পথে হাঁটছি?
আল্লাহ তাআলা বনি ইসরাইলকে তাদের প্রাপ্ত নেয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, ‘হে বনি ইসরাইল! তোমরা আমার সে সকল নেয়ামতের কথা স্মরণ কর, যা আমি তোমাদের দান করেছি…।’(সুরা : বাকারা, আয়াত : ৪০)
আল্লাহ তাআলা এই আয়াতে বনি ইসরাইলকে কৃতজ্ঞতার, দায়িত্ববোধ এবং প্রতিশ্রুতি রক্ষার প্রতি আহ্বান জানান। কেননা তারা ছিল এমন এক জাতি, যাদের প্রতি আল্লাহ বিশেষ অনুগ্রহ করেছিলেন। তিনি তাদের ফিরাউনের অত্যাচার থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন। আল্লাহ বলেন, ‘আমি তোমাদের ফিরাউনের সম্প্রদায় থেকে উদ্ধার করেছিলাম, যারা তোমাদের কঠিন শাস্তি দিত…।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ৪৯)
এ যেন এক অলৌকিক মুক্তি—যেখানে দুর্বল এক জাতিকে শক্তিশালী জালিমের হাত থেকে বাঁচানো হয়। এরপর আল্লাহ তাদের জন্য সাগর দ্বিখণ্ডিত করেন। কোরআনের ভাষায়, ‘আমি তোমাদের জন্য সাগর দ্বিখণ্ডিত করেছিলাম এবং তোমাদের উদ্ধার করেছিলাম…।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ৫০)
শুধু তাই নয়, মরুভূমির কঠিন জীবনে আল্লাহ তাদের জন্য আসমানি খাদ্যের ব্যবস্থা করেন।আল্লাহ বলেন, ‘আমি তোমাদের ওপর মেঘ ছায়া দিয়েছিলাম এবং তোমাদের জন্য ‘মান্না’ ও ‘সালওয়া’ অবতীর্ণ করেছিলাম…।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ৫৭)
এগুলো ছিল এমন নেয়ামত, যা অন্য কোনো জাতির জন্য কল্পনাতীত। তবে এই নেয়ামতের বিনিময়ে আল্লাহ তাদের কাছ থেকে একটি অঙ্গীকার নেন। তিনি বলেন, ‘তোমরা আমার অঙ্গীকার পূর্ণ কর, আমি তোমাদের অঙ্গীকার পূর্ণ করব…।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ৪০)
এই অঙ্গীকারের মূল বিষয় ছিল—এক আল্লাহর ইবাদত, রাসুলদের প্রতি আনুগত্য, ন্যায়-নীতির অনুসরণ, এবং সমাজে ন্যায় প্রতিষ্ঠা।
কিন্তু ইতিহাসের করুণ দিক হলো, এই জাতি বারবার সেই অঙ্গীকার ভঙ্গ করেছে। এমনকি মুসা (আ.) তুর পাহাড়ে গেলে তারা বাছুর পূজা শুরু করে। বর্ণিত হয়েছে, ‘এরপর তোমরা বাছুরকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করলে, যখন তোমরা ছিলে জালিম।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ৫১)
এগুলো ছিল তাদের অবাধ্যতার জ্বলন্ত উদাহরণ—যেখানে তারা সরাসরি শিরকে লিপ্ত হয়। আরও একটি বড় অবাধ্যতা ছিল আল্লাহর নির্দেশিত শহরে বিনয়ের সাথে প্রবেশ না করা। আল্লাহ তাদের আদেশ করে বলেছিলেন, ‘আমি বলেছিলাম, তোমরা এ নগরে প্রবেশ কর এবং দরজা দিয়ে নত হয়ে প্রবেশ কর… কিন্তু তারা কথা পরিবর্তন করে দিল…।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ৫৮-৫৯)
তারা আল্লাহর আদেশকে বিকৃত করে, অবজ্ঞা করে—ফলে তাদের ওপর শাস্তি নেমে আসে। বনি ইসরাইলের আরেকটি গুরুতর অপরাধ ছিল সত্য গোপন করা। কোরআনের ভাষায়, ‘তোমরা সত্যকে মিথ্যার সাথে মিশ্রিত কোরো না এবং জেনে-শুনে সত্য গোপন কোরো না।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ৪২)
এমনকি তারা নিজেদের স্বার্থে আল্লাহর বাণী পরিবর্তন করে ফেলতো, যা একটি ভয়াবহ বিশ্বাসঘাতকতা। এভাবে বারবার নেয়ামত ও সতর্কবার্তা সত্ত্বেও তাদের অন্তর কঠোর হয়ে যায়। আল্লাহ বলেন, ‘এরপর তোমাদের হৃদয় কঠিন হয়ে গেল, পাথরের মতো, বরং তার চেয়েও কঠিন…।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ৭৪)
এ যেন একজন মানুষের আত্মার পতনের চূড়ান্ত পর্যায়—যেখানে উপদেশ, অলৌকিক নিদর্শন—কিছুই আর কাজ করে না। বনি ইসরাইলের ইতিহাস আমাদের মনে করিয়ে দেয়—নেয়ামত পাওয়া বড় বিষয় নয়, বরং সেই নেয়ামতের যথাযথ কদর করাই আসল পরীক্ষা। অঙ্গীকার করা সহজ, কিন্তু তা রক্ষা করাই প্রকৃত ঈমানের পরিচয়। যখন মানুষ আল্লাহর দান ভুলে যায়, সত্যকে আড়াল করে এবং নিজের প্রবৃত্তিকে প্রাধান্য দেয়, তখন তার অন্তর ধীরে ধীরে অন্ধকারে ঢেকে যায়—যেখান থেকে ফিরে আসা কঠিন হয়ে পড়ে। অতএব, তারাই সফল, যারা ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয়, নিজেদের সংশোধন করে এবং আল্লাহর সঙ্গে করা প্রতিশ্রুতিতে অটল থাকে।
মতিঝিলনিউজ/এআর