মতিঝিলনিউজ ধর্ম ও জীবন : প্রত্যেক মানুষই নিরাপদ জীবনের আকাঙ্ক্ষা করে। জীবনের বাঁকে বাঁকে বিপদ-আপদের ভিড়ে, অনিশ্চয়তায় ভরা এই দুনিয়ায় মানুষ আশ্রয় খোঁজে নিশ্চয়তার, প্রশান্তির। যদিও ইসলামের দৃষ্টিতে চূড়ান্ত নিরাপত্তার মালিক একমাত্র মহান আল্লাহ। তিনিই প্রকৃত রক্ষাকর্তা, তিনিই হেফাজতকারী।
কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর যদি আল্লাহ তোমাকে কোনো দুর্দশা দ্বারা স্পর্শ করেন, তবে তিনি ছাড়া তা দূরকারী কেউ নেই। আর যদি কোনো কল্যাণ দ্বারা স্পর্শ করেন তবে তিনিই তো সবকিছুর ওপর ক্ষমতাবান।’ (সুরা : আনআম, আয়াত : ১৭)
অতএব, প্রকৃত নিরাপত্তা আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে, তাঁর ইচ্ছা ছাড়া কোনো নিরাপত্তা টেকসই নয়। ইসলাম শুধু তাওয়াক্কুলের নামে নিষ্ক্রিয় বসে থাকার শিক্ষা দেয় না, বরং আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা (তাওয়াক্কুল) রাখার পাশাপাশি যথাযথ পন্থা অবলম্বনের নির্দেশ দেয়।
মহানবী (সা.) এক ব্যক্তিকে বলেছিলেন, ‘তোমার উটটি বেঁধে রাখো, তারপর আল্লাহর ওপর ভরসা করো।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২৫১৭)
এই সংক্ষিপ্ত বাণী ইসলামের এক গভীর নীতিকে স্পষ্ট করে, তাওয়াক্কুল মানে পন্থা অবলম্বন পরিত্যাগ নয়; বরং ক্ষতি থেকে রক্ষা কিংবা প্রয়োজন পূরণের ক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের পর ফলাফল আল্লাহর হাতে সোপর্দ করা।
এই নীতিই ব্যক্তিজীবন থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় পর্যায় পর্যন্ত সমানভাবে প্রযোজ্য। একজন মানুষকে যেমন নিজের নিরাপত্তার জন্য সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি, তেমনি একটি রাষ্ট্রেরও দায়িত্ব জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
কারণ শাসনক্ষমতা নিজেই একটি আমানত। এই আমানত রক্ষা করা রাষ্ট্রের কর্ণধারদের জন্য ফরজ। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের আদেশ দিচ্ছেন আমানতসমূহ তার হকদারদের কাছে পৌঁছে দিতে। আর যখন মানুষের মধ্যে ফয়সালা করবে তখন ন্যায়ভিত্তিক ফয়সালা করবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদেরকে কতই না সুন্দর উপদেশ দিচ্ছেন।
নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ৫৮)
শাসকদের দায়িত্বের ব্যাপারে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল। তোমাদের প্রত্যেককেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।’ (বুখারি, হাদিস : ৮৯৩)
এই হাদিস দ্বারা বোঝা যায়, শাসককেও তাঁর অধীনদের ব্যাপারে জবাবদিহি করতে হবে। রাখালের প্রধান কাজ যেমন তার পালকে নিরাপদ রাখা। সুতরাং জনগণের জান-মাল রক্ষা করা শাসকের অপরিহার্য দায়িত্ব।
জনগণকে সব ধরনের ক্ষয়ক্ষতি থেকে রক্ষার চেষ্টা করা এবং সম্ভাব্য ক্ষতি এড়ানোর জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব। হাদিস শরিফে ইরশাদ হয়েছে, ক্ষতি করাও উচিত নয়, ক্ষতির সম্মুখীন হওয়াও উচিত নয়। (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ২৩৪১)
এই নীতির আলোকে রাষ্ট্রের ওপর দায়িত্ব বর্তায়, সম্ভাব্য ক্ষতি প্রতিরোধ করা, দুর্ঘটনা কমানো এবং নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা। সড়ক, নৌপথ থেকে শুরু করে জনগণের কর্মক্ষেত্র ও বাসস্থান—সবখানে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা শুধু প্রশাসনিক কাজ নয়, বরং এটি একটি নৈতিক ও ধর্মীয় দায়িত্ব।
ইসলাম রাষ্ট্রের জনগণ ও মুসলিম ভূখণ্ডের নিরাপত্তাকে এতটাই গুরুত্ব দিয়েছে যে তা রক্ষায় নিয়োজিত ব্যক্তি যদি দায়িত্ব পালনকালে মৃত্যুবরণ করে, তার বিশেষ মর্যাদা রয়েছে। হাদিস শরিফে ইরশাদ হয়েছে, আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, কোনো ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় সীমান্ত অঞ্চল পাহারাদানরত অবস্থায় মারা গেলে আল্লাহ তার জন্য সেসব নেক আমলের সওয়াব প্রদান অব্যাহত রাখবেন যা সে করত, জান্নাতে তাকে রিজিক দান করবেন, কবরের বিপর্যয়কর অবস্থা থেকে নিরাপদ রাখবেন এবং কিয়ামতের ভয়ভীতি থেকে মুক্ত অবস্থায় ওঠাবেন। (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ২৭৬৭)
অতএব, বোঝা গেল ইসলামের দৃষ্টিতে রাষ্ট্রীয় দায়িত্বও এক ধরনের পবিত্র আমানত। নিরাপত্তার মালিক একমাত্র আল্লাহ; কিন্তু সেই নিরাপত্তা অর্জনের জন্য মানুষকে দায়িত্বশীল হতে হবে, কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। ব্যক্তি যেমন নিজের নিরাপত্তায় সচেতন থাকবে, তেমনি রাষ্ট্রও আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে জনগণের নিরাপত্তায় সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালাবে। তবেই গড়ে উঠবে একটি নিরাপদ, ভারসাম্যপূর্ণ ও আল্লাহভীরু সমাজ।
মতিঝিলনিউজ/এআর