মতিঝিলনিউজ র্ম ও জীবন ডেস্ক : মানুষের হৃদয় জয় করা যায় না সম্পদ, ক্ষমতা কিংবা বাহুবলের মাধ্যমে। মানুষের অন্তরে স্থায়ী ভালোবাসা সৃষ্টি করতে হয় উত্তম চরিত্র, ক্ষমা, বিনয় ও সুন্দর আচরণের মাধ্যমে। মহানবী (সা.) ছিলেন এর সর্বশ্রেষ্ঠ উদাহরণ। তিনি এমন একসময়ে আরবের মানুষের সামনে ইসলামের দাওয়াত নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন, যখন গোত্রে গোত্রে সংঘাত, প্রতিশোধ, অহংকার ও বৈষম্য ছিল সমাজের স্বাভাবিক চিত্র। অথচ অল্প সময়ের মধ্যেই তাঁর চারপাশে এমন একদল মানুষ তৈরি হলো, যারা তাঁর জন্য জীবন ও সম্পদ উৎসর্গ করতে প্রস্তুত ছিল। তাঁর এই অসাধারণ প্রভাবের পেছনে অনেক কারণ ছিল।
কোমলতা ও উত্তম চরিত্র
আল্লাহ তাআলা নবী (সা.)-এর চরিত্রের প্রশংসা করে বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আপনি মহান চরিত্রের অধিকারী।’ (সুরা : কলম, আয়াত : ৪)
আর সাহাবিদের সঙ্গে তাঁর আচরণ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহর পক্ষ থেকে রহমতের কারণেই আপনি তাদের প্রতি কোমল হয়েছেন। আপনি যদি রূঢ় ও কঠোর হৃদয়ের হতেন, তাহলে তারা আপনার চারপাশ থেকে সরে যেত। অতএব, আপনি তাদের ক্ষমা করুন, তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন এবং কাজে তাদের সঙ্গে পরামর্শ করুন।
’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১৫৯)
ভুল করলেও অপমান না করা
নবী (সা.) মানুষের ভুল সংশোধন করতেন। কিন্তু এমনভাবে করতেন, যাতে ভুলকারী ব্যক্তি অপমানিত না হয়। একবার এক বেদুইন মসজিদে প্রস্রাব করে ফেলল। সাহাবিরা তাকে থামাতে এগিয়ে গেলে নবী (সা.) বললেন, তাকে ছেড়ে দাও। লোকটি শেষ করার পর সেখানে এক বালতি পানি ঢেলে দেওয়ার নির্দেশ দিলেন।
পরে তাকে বুঝিয়ে বললেন, মসজিদ এ ধরনের কাজের জন্য নয়; বরং এটি আল্লাহর জিকির, নামাজ ও কোরআন তিলাওয়াতের স্থান। (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৮৪)
এখানে নবী (সা.) ভুল কাজটিকে সমর্থন করেননি; বরং ভুলকারী ব্যক্তিকে এমনভাবে সংশোধন করেছেন, যাতে পরিস্থিতি আরো খারাপ না হয়। কারণ তিনি জানতেন, অজ্ঞ মানুষকে অপমান করলে সে সত্য থেকে আরো দূরে সরে যেতে পারে।
হাসিমুখে কথা বলা ও শোনা
নবীজি (সা.) মানুষের সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলতেন। জারির ইবন আবদুল্লাহ (রা.) বলেন, তিনি ইসলাম গ্রহণ করার পর যখনই রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে যেতেন, নবী (সা.) তাঁকে দেখে হাসতেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৩০৩৫)
মানুষের হৃদয় জয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায় হলো গুরুত্বের সঙ্গে মানুষের কথা শোনা। তাই নবী (সা.) মানুষের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতেন। কেউ তাঁর কাছে এলে তাকে অবহেলা করতেন না। কোরআনে আল্লাহ তাআলা নবী (সা.)-এর উম্মতের প্রতি গভীর মমতার কথা উল্লেখ করে বলেছেন, ‘তোমাদের কষ্ট তাঁর কাছে কষ্টদায়ক; তিনি তোমাদের কল্যাণের ব্যাপারে অত্যন্ত আগ্রহী এবং মুমিনদের প্রতি স্নেহশীল, পরম দয়ালু।’ (সুরা : তাওবা, আয়াত : ১২৮)
অসহায় ও দরিদ্র মানুষের প্রতি মমতা
তিনি ধনী-গরিবের ভেদাভেদ করতেন না। তিনি দরিদ্র ও দুর্বল মানুষদের সম্মান করতেন। তাদের সঙ্গে বসতেন, তাদের কথা শুনতেন এবং তাদের অধিকার নিশ্চিত করতেন। তিনি বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি বিধবা ও মিসকিনের জন্য চেষ্টা করে, সে আল্লাহর পথে মুজাহিদের মতো।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৯৮২)
তিনি এতিম, মিসকিন ও অসহায়দের প্রতি যত্নশীল হতে উৎসাহ দিয়েছেন। কোরআনেও বারবার দুর্বল মানুষের অধিকার রক্ষার নির্দেশ এসেছে।
প্রতিশোধ নয়, ক্ষমা
মক্কা বিজয়ের দিন নবী (সা.)-এর হাতে ছিল সর্বময় ক্ষমতা। যারা তাঁকে মক্কা থেকে বের করে দিয়েছিল, সাহাবিদের ওপর নির্যাতন চালিয়েছিল এবং তাঁর বিরুদ্ধে একের পর এক যুদ্ধ করেছিল, সেদিন তারা তাঁর সামনে অসহায় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। চাইলে তিনি প্রতিশোধ নিতে পারতেন; কিন্তু তিনি ক্ষমার পথ বেছে নিলেন।
নবীজি (সা.) প্রতিশোধের পরিবর্তে মানুষের হেদায়েতকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। তায়েফের ঘটনাটি এর একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। তায়েফবাসী তাঁকে প্রত্যাখ্যান করেছিল, তাঁর ওপর পাথর নিক্ষেপ করেছিল এবং তাঁর শরীর রক্তাক্ত হয়ে গিয়েছিল। এমন অবস্থায় পাহাড়ের ফেরেশতা এসে জানালেন, চাইলে তিনি দুই পাহাড়কে তাদের ওপর চাপিয়ে দিতে পারেন; কিন্তু তিনি তা গ্রহণ করেননি, বরং তিনি আশা করেছিলেন, তাদের বংশধরদের মধ্য থেকে এমন মানুষ জন্ম নেবে, যারা এক আল্লাহর ইবাদত করবে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৭৯৫)
নবী (সা.)-এর প্রতি প্রকৃত ভালোবাসার প্রমাণস্বরূপ শুধু তাঁর নাম উচ্চারণ করা কিংবা তাঁর ওপর দরুদ পাঠ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকা; বরং তাঁর আদর্শ ও চরিত্রকে নিজেদের জীবনে ধারণ করা উচিত।
মতিঝিলনিউজ/এআর